Home / Featured / নিষিদ্ধ নগরীর যত বীভৎস প্রথা !

নিষিদ্ধ নগরীর যত বীভৎস প্রথা !

তিব্বত, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৯৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এক ভূপৃষ্ঠ। হিমালয়ের মত পর্বত, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র আর ইন্দুসের মত নদী, মানস সরোবরের মত বহু লেক আর নিজস্ব এক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট – এইতো তিব্বত! এককথায় যাকে বলা যায় Unique !

শুধ‍ু তাই নয়, তিব্বতের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় প্রথা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য; যা এই বিশ্বায়নের যুগেও আজও প্রায় অটুট ! তবে এই তিব্বতের পৃথিবী জুড়ে একসময় খ্যাতি ছিল নিষিদ্ধ জনপদ বলে !

তিব্বতের রাজধানী লাসায় বহিরাগতদের প্রবেশ ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। লাসার বাজার চত্বরে গুপ্তচর সন্দেহে কত মানুষের মুণ্ডু কাটা পড়েছে তার সঠিক হিসেব কেবল ওইসব অতৃপ্ত আত্মারাই দিতে পারবে!

কেন এই নিষ্ঠুরতা? নাকি সতর্কতা! যদি সতর্কতাই  হয়, তবে কেন এই সতর্কতা?

দুর্গম প্রাকৃতিক পরিবেশ সারা পৃথিবীর কাছ থেকে তিব্বতকে আড়াল করে রেখেছিল, করে তুলেছিল দূর্ভেদ্য। তার উপর তিব্বতের এই বার্তি সতর্কতা! খোদ ব্রিটিশরা প্রত্যক্ষ করেছে কতটা  দূর্ভেদ্য হতে পারে তিব্বত! যা তিব্বতকে করে তুলেছিল আরও বেশি  রহস্যময়! আর সে সময়ের তিব্বতকে ঘিরে মানুষের অতি কল্পনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল তিব্বতের কিছু সামাজিক রীতিনীতি, কিছু ধর্মীয় ক্রিয়া কলাপ! যা আজ বিদ্যমান! যেমন, তিব্বতীয় বৌদ্ধদের বায়বীয় সমাধি বা শূন্যের মাঝে সমাধিস্থ করার রীতি!

আজকের তিব্বত অতীতের মত আর নিষিদ্ধ নয়, নয় অতি দুর্গম ! ফলে অবসান ঘটেছে  অনেক জল্পনা কল্পনার! কিন্তু আজো টিকে আছে তিব্বতীয় বৌদ্ধদের বায়বীয় সমাধী বা শূন্যের মাঝে সমাধিস্থ করার মত অদ্ভুত কিছু রীতি! যা দেখে মনের কনে সংশয় উদয় হয়, তবে কি অতীতের কল্পনা গুলো বাস্তব ছিল?


কেমন এই বায়বীয় সমাধি বা শূন্যের মাঝে সমাধিস্থ করার রীতি? চলুন জেনে নেইঃ

এই প্রক্রিয়ায় মৃতদেহকে কবর বা মাটি চাপা দেয়া হয়না বা পুড়িয়ে ফেলা হয় না ! বরং কোনো এক পর্বতের উপর নির্দিষ্ট স্থানে উম্মুক্ত অবস্থায় পশু পাখির খাদ্য রূপে কেটে কেটে সরবরাহ করা হয় ! এ ক্ষেত্রে , মৃতব্যাক্তির লাশ ধর্মীয় আচার শেষ করে ৩য় দিন পর সাদা কপড়ে  মুড়ে পর্বতের চূড়ায় আনা হয়। সেখানে সন্ন্যাসীরা লাশের সাদা কপড় খুলে নেন। তারপর কয়েকজনে মিলে নিয়ম মত  লাশটা কাটতে শুরু করেন। প্রথমে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলোকে আলাদা করে নেয়া হয়। তারপর হাড় থেকে  মাংস কেটে আলাদা করা হয় । এরই মধ্যে সেখানে এসে হাজীর হয়ে যায় শকুন,চিল ও অন্যান্য মাংসাশী প্রাণী। মাংসের টুকরো গুলো সন্ন্যাসীরা পশু পাখির দিকে ছুঁড়ে দেন। বেঁধে যায় হুলস্থূল !

কি খারাপ লাগছে? আপনার খারাপ লাগলে সন্ন্যাসীদের কিন্তু এসময় মাঝেমাঝে হাসাহাসি করতে দেখা যায় ! ভাবছেন কেনো?

উত্তর হল <strong>দৃষ্টিভঙ্গি</strong> ! সব শেষে থেকে যায় হাড়। সেটাকেও গুঁড়ো গুঁড়ো করা হয়। তারপর সেই হাড়ের গুঁড়ো গুলোর সাথে আটা, চালের গুঁড়ো বা এধরনের কিছু মিশিয়ে ছোট পাখিদের সরবরাহ করা হয়। এসময় সাধারণ মানুষরা চাইলে খুব কাছ থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে পারে। যাতে তারা মৃত্যুকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারে ও নশ্বর মানব দেহের যে কোন মূল্য নেই তা বুঝতে পারে !

বৌদ্ধ ধর্মের ২টি প্রধান ধারা থেরেভাদা ও মহায়ানা। মহায়ানা ধারার আরেকটি উপধারা হল ভাজ্রাসানা বা ভাজ্রায়ানা। এই ভাজ্রায়ানা ধারার বৌদ্ধরা মৃত দেহকে সৎকার করার এই প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেন । তবে উঁচু স্তরের  লামাদের এই প্রক্রিয়ায় সৎকার করা হয় না! তাছাড়া গর্ভবতী নারী, দুর্ঘটনা ও সংক্রমক রোগে মৃত ব্যক্তি ও ১৮ বছরের কম বয়সীদের মরিত দেহ ও এই প্রক্রিয়ায় সৎকার করা হয়না।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো এই প্রক্রিয়াকরণ প্রথা ?

আসলে বৌদ্ধ ধর্মের ২টি প্রধান ধারা হল – থেরেভাদা ও মহায়ানা। এই মহায়ানা ধারার আরেকটি ধারা হল ভাজরাসানা বা ভজরায়ানা। এই ভাজরায়ানা ধারায় মৃত দেহকে এই প্রক্রিয়ায় সৎকার করার রীতি চালু আছে! তাঁরা বিশ্বাস করেন মানুষের মূল সত্ত্বাটিই আসল। দেহ এই মূল সত্ত্বাটির বাহন মাত্র। মৃত্যুর পর মানুষের মূল সত্ত্বাটি আরেকটি জীবনচক্রে প্রবেশ করে। ফলে বাহন হিসেবে মৃতদেহের আর কোন মূল্য থাকে না! বরং এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির কিছুটা কাজে আসে!

আর কি কোনো কারণ থাকতে পারে? হয়ত পারে !

যেমনঃ পর্বতের রুক্ষ কঠিন পাথর কেটে কবর দেয়া বেশ পরিশ্রমসাধ্য! দাহ করা হলে তার অবশিষ্ট থাকছে! এ দেহের শেষ পরিণতি হল প্রকৃতিতে মিশে যাওয়া! তাই এভাবে হলে ক্ষতি কি!

প্রকৃত বিষয়টি বিঝে ওঠা আমাদের জন্য বেশ কঠিন! বুঝতে হলে, এইসব অদ্ভুত প্রথা ও রীতি-নীতি গুলো বিশ্লেষণ করতে হবে বিবেচনার সাথে। তবেই উপলদ্ধিতে আসবে সত্য! যা আবশ্যক!

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য , সরল ও বন্ধুবাৎসল্য মানুষ, সমৃদ্ধ ও নিজস্ব সংস্কৃতি – আর তার সাথে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু রীতিনীতি – সব মিলিয়ে আজকের তিব্বত! আর এই তিব্বতের সাথে রয়েছে আমাদের এক গভীর সম্পর্ক! মানবতার জয় হক!