Home / Sports / আমাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ যেনো আমরাই

আমাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ যেনো আমরাই

জাতিগতভাবে আমরা বেশ সাহসী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভীষণ রকমের দুঃসাহসী। যার ফলাফল স্বরূপ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের হিমালয় জয়, ওয়াসফিয়া নাজরিনদের বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো, নোবেল জয়, ম্যাশ-সাকিব-মুস্তাফিজের মত অবাক বিস্ময়, বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছেলে মেয়েদের পদচারণা এবং এমন আরো অনেক কিছু।

আমাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ যেনো আমরাই

অন্যদিকে আমরা ভীষণ রকমের সংকীর্ণমনা। আমরা অন্যের ভালো দেখতে পারি না। কেউ আমাদের উপরে উঠে গেলে আমরা কর্মদক্ষতায় তাঁর উপরে উঠার চেষ্টা করিনা, বরং আমরা তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করি। প্রতিপক্ষের ক্ষমতা বিচার করিনা। আমাদের কাছে উ‍ৎসব মানে পাহাড়ি ধর্ষণ, আমাদের কাছে উ‍ৎসব মানে নারী লাঞ্ছনা, উৎসব মানে কারো না কারো ক্ষতি করা। আমাদের কাছে প্রতিশোধ মানে ভরে দেয়া, ভাইঙ্গে দেয়া, বাঁশ দেয়া, *দে দেয়া, ঠা*য়ে দেয়া।

এবং এটা আমরা ব্যক্তিজীবন থেকে রীতিমত কর্পোরেট কালচারে নিয়ে ঠেকিয়েছি। দেশের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী যখন কোন দেশের পতাকাকে দেয়াল থেকে সাদা রঙে মুছে দেবার বিজ্ঞাপন দেয়, দেশের প্রতিষ্ঠিত কনজ্যুমার ব্র্যান্ড যখন পশ্চাতে বাঁশ ভরে দেবার মত ইঙ্গিত দেয়, আমাদের মানসিকতা ফুটে ওঠে, সত্যিই এটাই আমাদের প্রতিরূপ কিনা ভেবে শংকিত হই।

আমরা খেলার মাঠে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মায়ের সম্ভ্রমের প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা চালাই, অথচ তাদের মন থেকে ঘৃণা করতে পারিনা। আমরা জিতি, আমরা উল্লাস করি, কিন্তু সেটা পাশবিকভাবে, হিংস্রতায় কানায় কানায় ভর্তি হয়ে। আমাদের ছেলেরা যখন ক্রমাগত নিজেদের মানোন্নয়নে ব্যস্ত, আমরা সোচ্চার খিস্তি খেউরে।

আমরা মাঠের ভেতর তিস্তার পানি আনি, মাঠের ভেতর ফেলানী হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য মুখিয়ে থাকি, অথচ তাদের প্রোডাক্টকে বয়কট করতে পারি না, তাদের কোন সেলিব্রেটি দেশে এলে আমাদের মন্ত্রী পর্যায়ের লোকজনেরা পর্যন্ত মাটিতে বসে অনুষ্ঠান দেখে। আমাদের চলচ্চিত্রের প্রথম পছন্দ থাকে তাদের ছবি। আমাদের ভ্রমণের প্রথম পছন্দ থাকে তাদের দেশ, কনসার্টের প্রথম পছন্দ তাদের দেশের শিল্পী !

আজ এশিয়া কাপ ফাইনালে জিততে না পেরে যে পরিমাণ ট্রল আমাদের নিয়ে প্রতিপক্ষ করছে, তার জন্য দায়ী আমদেরই কিছু অতি উৎসাহী অসভ্য নাগরিক। আমরা ক্ষণে ক্ষণে, মুহূর্তে মুহূর্তে তাদেরকে অসভ্য বলি, তাদেরকে রেপিস্ট বলি, কিন্তু অসভ্যতায় তাদের সাথেই পাল্লা দেই। মাঝে মাঝে তাদেরকে ছাড়িয়েও যাই। আমাদের উদীয়মান তরুণ খেলোয়াড়ের হাতে তাদের খেলোয়াড়ের কাটা মাথা ধরিয়ে দেবার মত বীভৎস চিন্তাও আমাদের মাথায় আসে, যেনো এটা খেলা নয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। আধুনিক সভ্যতার যুগে শত্রুর সাথে শত্রুতাও ভদ্রতা রেখে করতে হয়, সেটার একটা ভাষা আছে। কিন্তু আমাদের সেই ভাষা অসভ্য। আমরা শত্রুর অসভ্যতাতে ক্ষিপ্ত হই, এর জবাব দেই সহস্র গুণ অসভ্যতা করে। আমরা খেলাকে এক দলের সাথে আরেক দলের খেলা হিসাবে দেখি না। আমাদের খেলা হয় “আল্লাহ” আর “ভগবানের” মধ্যে।

আজ যখন আমরা হেরে গেছি, প্রতিপক্ষের হাস্যরসের জবাব মেনে নিতে পারছি না। একবার ভেবে দেখুন তো, আজ আমরা জিতলে কি করতাম? নিশ্চয়ই পাশের বাড়ির কোনো হিন্দু ছেলের সামনে প্রতিপক্ষ দলকে মালাউন বলে গালি দিতাম, প্রতিপক্ষের দাদাদের ধুতি খুলে দিতাম, তাদের ধর্ম নিয়ে যাচ্ছেতাই বলে একাকার করে দিতাম। যদিও সেই হিন্দু ছেলেটি মনে প্রাণে বাঙ্গলাদেশকেই সাপোর্ট করেছিলো।

আচ্ছা, কখনো কি আমরা দেখেছি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড অথবা শ্রীলংকার কোনো সমর্থক রুবেলকে দেখামাত্রই গ্যালারী থেকে হ্যাপি হ্যাপি বলে স্লেজিং করছে অথবা কোহলীকে দেখে আনুশকা আনুশকা বলে চেচাচ্ছে? শুধুমাত্র আমাদের পক্ষেই সম্ভব নিজেদের দেশের খেলোয়াড় অথবা অন্য দেশের খেলোয়াড়কে কাইল্যা, বাইট্যা, কুত্তা, রেপিস্ট, এমনকি প্রেমিকার নাম, এসব বলে স্লেজিং করা। আমরা সম্মান পাবো কিভাবে? খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগতই থাক না ! যদি সে অপরাধী হয়, তবে তার জন্য তার দেশের অথবা ক্রিকেট কাউন্সিলের নিজস্ব আইন আছে, তাই না?

আমরা ফাকিস্তান বলতে পারবো, আমরা রেন্ডিয়া বলতে পারবো, অথচ আমরা “কাংলাদেশ” শোনার জন্য প্রস্তুত থাকব না, তা কি হয়? আজ প্রতিপক্ষ জিতে যাওয়ায় ধোনির হাতে তাসকিনের কাটা মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে, আমাদের কি সহ্য হচ্ছে? আমাদের দলের ক্রমাগত ভালো করতে থাকা ছেলেরা আমাদের কারণে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের কাছে ছোট হচ্ছে। তা তো হবেই, আমরা নিজেরাই তো নিজেদের সম্মান দেই না, আমরা কথায় কথায় সাকিবের বউকে *দে দেই, মা বোনদের পর্যন্ত ছাড়িনা, তাঁর সদ্য জন্মগ্রহণ করা কন্যা আমাদের চোখে ভবিষ্যত সানী লিওন হয়, তামিমের অফ ফর্মের জন্য মধ্যরাতে তাঁর স্ত্রীকে গালাগাল দেই, মুশফিকের মাকেও এক হাত দেখে নেয়া হয়েছে অতীতে ! তো প্রতিপক্ষরা কি আমাদের কোলে বসিয়ে চুমাবে?

স্লেজিং সব খেলাতেই থাকবে। প্রতিপক্ষ কখনোই আমাদের ভালো বলবেনা, আমরাও বলবোনা। কিন্তু সেই কটুক্তির ভাষা আছে। নিজেদেরকে আদর্শ ভাবতে হলে আগে দরকার নিজেদের সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা অবশ্যই সেরা, স্ট্যাটিস্টিক্যালি আমাদের ক্রিকেট দল অন্যান্য সব দল থেকে অল্প সময়ে বেশী অগ্রসর। কিন্তু তাঁদের সেই অবদান ম্লান হয়ে যায় আমাদের মত বাজে সমর্থকদের কারণে। আসলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমরা জিততে চাই আমাদের দলের অর্জন হিসেবে নয়, আমাদের চাওয়াটা থাকে প্রতিপক্ষকে “একদম পুরোটা ভরে দেয়া” !

অন্যেরা আমাদের প্রতি অন্যায় করেনা, তা নয়। মোড়ল ক্রিকেটার দেশসমূহ আমাদের প্রতি যে আচরণ করেছে তা ভুলিনি, তবে সেটার জবাব অবশ্যই ব্যাটে-বলে দিতে হবে। আমরা বড়জোর আমাদের অবস্থানে থেকে শালীন ভাবে সেটা মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে পারি। আমরা যে দুর্বল নই, তা প্রমাণে আমাদের মাশরাফি বাহিনী সদা সচেষ্ট। আমরা ঘরে বসে গালাগালি করলে আর বিজ্ঞাপন বানালে সেই অপবাদ ঘুচবে না। বরং জাতি সিসাবে নিজেদেরই ছোট করা হবে।

আমাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ যেনো আমরাই… 🙂