Home / Religion / রাসুল (সঃ) কি নূরের তৈরি, না মাটির তৈরি?

রাসুল (সঃ) কি নূরের তৈরি, না মাটির তৈরি?

রবিউল আউয়াল মাসটি রাসূল (সাঃ) এর জন্ম ও মৃত্যুর মহিমায় ইসলামের ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। প্রতিবছর এ মাস এলেই বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সাজ সাজ রব পড়ে যায় এবং মাসব্যাপী রাসুলের (সাঃ) জীবনদর্শন সম্পর্কিত আলোচনা ও পর্যালোচনা দেখা যায়। এর মধ্যে প্রিয়.কমের ইসলাম বিভাগের প্রধান মাওলানা মিরাজ রহমান উপস্থাপিত ও পরিচালিত নিউইয়র্ক ভিত্তিক টিভি চ্যানেল আইটিভির রবিউল আউয়াল অনুষ্ঠানে রাসুল (সাঃ) এর জীবনীকেন্দ্রিক চলমান বেশ কিছু বির্তকের সমাধান নিয়ে কথা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে নানা প্রশ্নের জবাব তুলে ধরেন কুষ্টিয়া ইউভার্সিটির আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রধান ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর।

 

রাসূলের (সাঃ) জন্ম তারিখ নিয়ে এত মতবিরোধ কেন? মিরাজ রহমানের এমন প্রশ্নের মাধ্যমে শুরু হয় আইটিভির ‘আলোকিত রবিউল আউয়াল’ অনুষ্ঠানটি। উত্তরে ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন, ইসলামে মূলত বিধিবিধানের গুরুত্ব বেশি। এসব বিষয়ের গুরুত্ব খুবই কম। মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুল (সাঃ) সোমবারে রোজা রাখতেন। আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, আপনি কেন সোমবারে রোজা রাখেন? রাসুল (সাঃ) বলেন, আমি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছি এবং সোমবার দিনে নবুয়ত পেয়েছি। পরবর্তীতে সাহাবিদের হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি সোমবার দিনে হিজরত করেছেন। এবং এরপরে সোমবার দিনেই তার ওফাত হয়। কিন্তু বছরের কোন তারিখে তার জন্ম হয়েছে? এটা কোরআনে তো নেই। কোনো হাদিসে নেই। সাহাবীগণ ও অন্যান্যদের থেকে এ ব্যাপারে বিভিন্ন রেওয়াতে অন্তত তেরোটি মত রয়েছে। এর ভেতরে কিছু জাল হাদিস আছে। কোনো কোনো সাহাবি থেকে রবিউল আউয়ালের ৮ তারিখ ও ২ তারিখের কথা বর্ণিত হয়েছে। আমাদের সমাজে যে ১২ তারিখ বলে মশহুর, এটা তৃতীয় শতকের একজন ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন। তবে এইসব মতামতের মধ্যে শক্তিশালী মত অনুসারে মুহাদ্দিসীনরা রবিউল আউয়াল মাসের ৮ তারিখকে সবচে’ বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

 

আমাদের বাংলাদেশে সিরাতুন্নবী ও মিলাদুন্নবী শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়- এ সম্পর্কে ভাষ্যকার মাওলানা মিরাজ রহমান জানতে চাইলে খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন, আমি দর্শকদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, আমরা কোন ইসলাম পছন্দ করব। একটা হলো, রাসুল (সাঃ) ও সাহাবীদের ইসলাম। আরেকটি হলো, আমাদের নিজেদের আবেগে নির্মিত ইসলাম। আমরা যদি সাহাবীদের যুগে ফিরে যাই, তবে দেখব মিলাদকে তারা কোনো গুরুত্বই দেননি।

 

মিলাদ বলতে কি বুঝায়, এর উত্তরে আলোচক বলেন, মিলাদ মানে হলো নবীজীর জন্ম। কিন্তু সিরাতুন্নবী হলো, নবীজীর সম্পূর্ণ জীবন। ইসলামে প্রথম ছয়শত বছরে মিলাদুন্নবীর উপরে একটি বইও লেখা হয়নি। কিন্তু সিরাতের উপর হাজার হাজার গ্রন্থ রচিত হয়েছে। ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর আরো বলেন, বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে যে ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হয়, তা আসলে ৬০০ হিজরির পরে ঈদে মিলাদে মাসিহ নামে খ্রিস্টানদের অনুষ্ঠান থেকে এসেছে। রাসুলকে কোরআনে বলা হয়েছে, উসওয়াতুন হাসানা। মিলাদের মধ্যে তো কোনো উসওয়াতুন হাসানা নেই। উসওয়াতুন হাসানা আছে তার সিরাতের মধ্যে।

 

একজন মুসলমান হিসেবে রবিউল আউয়াল মাসে করনীয়-বর্জনীয় কি কি? এই প্রশ্নের উত্তরে ড. জাহাঙ্গীর বলেন, আবেগ নির্ভর না হয়ে রাসুলের অনুসরণ করতে হবে আমাদের। সুন্নত পদ্ধতির দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। রাসুল [সা.] আমাদের শিখিয়েছেন, সোমবার রোজা রাখার কথা। রাসুলের (সাঃ) সিরাত নিয়ে আমরা বেশি বেশি আলোচনা করতে পারি। কিন্তু সেটাও যেন নির্দিষ্ট একটি মাসে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়াম করতে পারি, কিন্তু র‌্যালি করব, মিছিল করব, এগুলো হতে পারে না।

 

রাসুল (সাঃ) কি নূরের তৈরি নাকি মাটির তৈরি? এই প্রশ্নের উত্তরে আলোচক বলেন, আমাকে একবার ইসলামিক টিভিতে লাইভ প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাসুল নূরের তৈরি হলে আপনাদের সমস্যা কি, আপত্তি করেন কেন ? আমি বললাম, আমার মনেও এই প্রশ্ন আছে যে, রাসুল (সাঃ) নূরের তৈরি, এই কথাটা বলতে আল্লাহর অসুবিধাটা কি ছিল? আল্লাহ কেন বারবার কোরআনে বললেন, হে নবী তুমি মানুষ ! হে নবী তুমি কিন্তু মানুষ। বারবার কোরআনে আল্লাহ রাসুলকে মানুষ বলে বলে সম্বোধন করেছেন, যা মাটির তৈরি।

 

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন, এটাও আসলে এসেছে খ্রিস্ট ধর্ম থেকে। ঈসা (সাঃ) গত হওয়ার পরে খ্রিস্টানদের একটি গোষ্ঠী তার সম্পর্কে প্রচার করে, তিনি আল্লাহর জাত থেকে তৈরি। আল্লাহর নূরের অংশ। এটা তারা তার প্রতি অতিভক্তির বশবর্তী হয়ে বলে। আমাদের এই ধারণাটা ভুল যে, মানুষ অন্যকিছুর দ্বারা তৈরি হলে তার দাম বাড়ে। ফেরেশতারা নূরের তৈরি, আদম মাটির তৈরি। অথচ ফেরেশতারা আদমকে সেজদা করেছে। ইবলিশ এই প্ররোচনা দেয় যে, আমি আগুনের তৈরি, সুতরাং আমি উত্তম। আসলে মানুষের কর্ম হলো উত্তম-অনুত্তমের নির্ধারক। নবীর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে বহু উম্মত ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের এই ব্যাপারে সর্তক থাকা উচিত।