মীর কাশেমের ফাঁসি কার্যকর ! কাটা হয়েছে ঘাড়ের রগ

অবশেষে কাশিমপুর কারাগারেই যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেমের ফাঁসি কার্যকর করা হলো ! আজ ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার রাত সাড়ে দশটায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মীর কাশেমের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে ।

 

এই প্রথমবারের মতো কাশিমপুর কারগারে কোন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। শনিবার রাতে তার ফাঁসি কার্যকর হয়। এর মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি দিয়ে কলঙ্কমোচনের পথে এগিয়ে গেল দেশ।

 

শনিবার রাতের মধ্যেই মীর কাশেমের মরদেহ মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার গ্রামের বাড়ি চালায় নিয়ে তার পরিবার পরিজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রবিবার সেখানকার পারিবারিক কবরস্থানে তার নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে। একাত্তরের মূল ঘাতক ও জামায়াতের শীর্ষনেতা এবং দেশ বিদেশে তদ্বির করে বিরাট অঙ্কের টাকায় লবিস্ট নিয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বন্ধে ও ফাঁসি কার্যকরের বাধা সৃষ্টির পর ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় দেশের জন্য তাই রচিত হলো আরেকটি নতুন ইতিহাস।

 

১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে ডালিম হোটেলে হত্যাসহ বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেফতার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ কারাগারে পাঠানো হয় মীর কাশেম আলীকে। ২০১৪ সালের ২ নবেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মীর কাশেম আলীকে ২টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং ৮টি অভিযোগে ৭২ বছরের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে আপীল করেন। আপীলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত ৮ মার্চ আপীল বিভাগ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদকে খুনের দায়ে ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। গত ৬ জুন আপীল বিভাগ মীর কাশেমের ফাঁসি বহাল রেখে ২৪৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। মীর কাশেম ১৯ জুন ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন দাখিল করেন। রিভিউ আবেদনে ১৪টি যুক্তি উত্থাপন করে ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস চান তিনি। এই রিভিউ আবেদনের ওপর ২৪ আগস্ট শুনানি শুরু হয়। ২৮ আগস্ট শুনানি গ্রহণ শেষ করে ৩০ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করা হয়। ৩০ আগস্ট মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ রিভিউ আবেদন খারিজের রায় দেন মঙ্গলবার। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদন করা নিয়ে নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার শর্তারোপ করে কালক্ষেপণের কৌশলের পর্যায়ে শুক্রবার প্রাণভিক্ষা চাইবেন না জানিয়ে দিলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

চূড়ান্ত রায়ের পর মীর কাশেম তার নিখোঁজ সন্তান ফিরে না আসা পর্যন্ত প্রাণভিক্ষার সিদ্ধান্ত নেবেন না বলে জানিয়েছিলেন। তবে মত পাল্টে শুক্রবার তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপর মীর কাশেমের ফাঁসি কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শুক্রবার থেকেই কাশিমপুর কারাগারের চারপাশে, বিশেষ করে কারা ফটকের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারা ফটকেও তল্লাশি করে নিয়মিত দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়। শুক্রবার রাতেই ফাঁসি কার্যকর করা হচ্ছে এমন কথা চাউর হলেও পরে কারাকর্তৃপক্ষ জানান, শুক্রবার ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। শনিবার পরিবারের লোকজনদের শেষ সাক্ষাতের জন্য সাড়ে তিনটায় যাওয়ার খবর দেয়া হলে মোটামুটি ধরে নেয়া হয় মীর কাশেম আলীর ফাঁসি হয়েই যাচ্ছে ও ফাঁসি হয়েই গেল।

 

ফাঁসি দেয়ার নির্বাহী আদেশ

শনিবার বিকেল তিনটায় একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সরকারের নির্বাহী আদেশ নিয়ে কারাগারে পৌঁছান। বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে লাল খামের মধ্যে বার্তা পাঠানো হয় গাজীপুরের ডিসি, এসপি, সিভিল সার্জনকে। বার্তা পাঠানো হয় মীর কাশেম আলীর মানিকগঞ্জের গ্রামের বাড়িতেও। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া মীর কাশেম আলীকে ফাঁসি দেয়ার নির্বাহী আদেশ শনিবার গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে এসে পৌঁছেছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলার মোঃ নাশির আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কারাগারে এসে আদেশের কপি তাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। এ আদেশের কপি যখন কারাগারে এসে পৌঁছায় তখনও মীর কাসেমের সঙ্গে সাক্ষাত করতে তার পরিবারের ৪৮ জন সদস্য কারা অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন।

 

স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাত

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর সঙ্গে দেখা করেছেন তার স্বজনরা। ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের এই সাক্ষাতপর্বে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন তার পরিবার সদস্যসহ ৩৮ জন স্বজন। অবশ্য কারাগারের ভেতরে সাক্ষাতের উদ্দেশে ঢুকেছিলেন ৩টি শিশুসহ তার পরিবারের ৪৭ জন সদস্য। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক। তিনি জানান, ‘বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট থেকে ৫টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ৩৮ জন স্বজন মীর কাশেমের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন।

 

স্বজনদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ৮/১০ জন করে গ্রুপ করে তাদের সাক্ষাত করতে দেয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে তারা কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। এ সময় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মীর কাশেম আলীর সঙ্গে দেখা করতে তার পরিবারের সদস্যরা গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার গেটে পৌঁছান শনিবার বিকেল ৩টা ৩৮ মিনিটে। ছয় শিশুসহ ৪৭ জন লোক মীর কাশেমের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে ৬টি গাড়িতে। মধ্যে দুইটি গাড়িতে ছিল কালো গ্লাস লাগানো। শনিবার সকালে কারা কর্তৃপক্ষ পরিবারের সদস্যদের তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ডাকেন বলে জানিয়েছেন মীর কাশেমের মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া।

 

মীর কাশেমের মেয়ে সুমাইয়া বলেন, ‘আমাদের ব্যক্তিগত সহকারীকে টেলিফোনে বিষয়টি জানান কারাকর্তৃপক্ষ। শনিবার সকালে কারাগার কর্তৃপক্ষ টেলিফোনে মীর কাশেমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, সাক্ষাতের জন্য কারাগারে হাজির হওয়ার সময় সাড়ে ৩টায়। শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার মধ্যেই ৬টি গাড়িতে পরিবারের সদস্যরা কাশিমপুর কারাগারের মেইন গেটের সামনে এসে পৌঁছান বিকেল সাড়ে তিনটার মধ্যেই। বিকেল সাড়ে ৩টায় কারাগারের মেইন গেটে পৌঁছান তারা। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে পরিবার পরিজনের সদস্যদের পাঠানো হয় কারগারের ভেতরে পাঠানো হয়। প্রায় ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ধরে সাক্ষাত ও কথাবার্তা শেষে সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৪০ মিনিটে বের হয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা।

 

যা বলেন স্ত্রী আয়েশা খানম

মীর কাশেম আলীর স্ত্রী সৈয়দা আয়েশা খানম সাক্ষাত শেষে কারাগার গেটের সামনে সাংবাদিকদের বলেছেন, মীর কাশেম আলী তাকে বলেছেন, মৃত্যুকে ভয় পাই না, বিচলিত নন। এই মৃত্যু শহীদী মৃত্যু। তবে আফসোস শেষ মুহূর্তে আমার ছেলেকে দেখে যেতে পারলাম না। কারাগার থেকে বের হয়ে মীর কাশেমের স্ত্রী জানান, উনি (মীর কাশেম আলী) বলেছেন, শেষ মুহূর্তে ছেলেকে দেখতে পারলাম নাÑ এই আক্ষেপ রয়ে গেল। ছেলে আমার পরিবারে ফিরে আসবে এ প্রত্যাশাই করি। আয়েশা খানম আরও জানান, উনি (মীর কাশেম আলী) বলেছেন, আমি জান্নাতে যাব। আমি আগে গিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব। তোমরা কান্নাকাটি করো না।

 

প্রিয় খাবার হালুয়া

মীর কাশেম আলীর সঙ্গে দেখা করার সময়ে তার প্রিয় খাবার হালুয়া নিয়ে গেছে তার পরিবার। শাহজালাল মাজার থেকে ওই হালুয়া আনা হয়েছে। হালুয়া খেয়েছেন তিনি। তাকে খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সেমাই, বিরিয়ানীসহ নানা ধরনের পছন্দের খাবারও।

 

কারাগারে আইজি প্রিজন

শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায় কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনকে। সরকারের নির্বাহী আদেশ পাওয়ার পর যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতির মধ্যেই কারাগারে যেতে দেখা যায় কারা প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে।

 

এর আধা ঘণ্টা আগে মীর কাশেমের সঙ্গে শেষ দেখা করে কারাগার থেকে ফিরে যান তার স্বজনরা। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার ২ এর জেলার নাশির আহমেদ জানান, দুপুরের পর সরকারের নির্বাহী আদেশ তাদের হাতে পৌঁছে। এর আগে অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল ইকবাল হাসানকে বেলা দেড়টার দিকে কাশিমপুর কারাগারে ঢুকতে দেখা যায়। এরপর বিকেল ৪টায় কারাগারে যান ডিআইজি প্রিজন্স গোলাম হায়দার।

 

ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত

জেলার নাশির আহমদ জানান, মীর কাশেম আলীকে রাখা হয়েছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর ৪০ নম্বর কনডেম সেলে। কারাগারের চিকিৎসকরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। তাকে স্বাভাবিক খাবার দেয়া হয়েছে। কারাগারের এক কর্মকর্তা শুক্রবারই জানিয়েছিলেন, ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি তারা নিয়েছেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের দক্ষিণ পূর্ব কোণে ফাঁসির মঞ্চটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। মোম মাখানো দড়িতে আনুমানিক ওজনের বালির বস্তা বেঁধে প্রাথমিক মহড়াও দেয়া হয়।

 

জল্লাদ শাজাহানের নেতৃত্বে ছয় জল্লাদকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান। জল্লাদ শাজাহানের সহযোগী হিসেবে আছে জল্লাদ রাজু, দ্বীন ইসলাম, রিপন, শাহীন ও কামাল। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য ফাঁসির মঞ্চ পাহারা দেয়ার জন্য মোতায়েন করা হয় ৩৬ জন কারারক্ষী। ১২ কারারক্ষীর হাতে থাকবে আগ্নেয়াস্ত্র ও অপর ১২ কারারক্ষী ছিল ঢাল ও লাঠি হাতে। ফাঁসি কার্যকরের জন্য রয়েছে ৬ জন জল্লাদ। জল্লাদ দলের নেতৃত্বে থাকবে একজন। অপর দুই জন থাকবে তার সহযোগী। ফাঁসির মঞ্চের সামনে জ্বালানো হয় ফ্লাড লাইট। ফাঁসির মঞ্চের সামনে তৈরি করা হয় একটি প্যান্ডেল যাতে ফাঁসি কার্যকর করার জন্য কর্মকর্তারা বসে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

 

যেভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়

মীর কাশেম আলীর পরিবার পরিজন সাক্ষাত করে যাওয়ার পর কনডেমড সেলে গিয়ে তাকে গোসল করিয়ে রাতের খাবার দেয়া হয়। কারাগারের মাওলানা হেলালউদ্দিনের মাধ্যমে তওবা পড়িয়ে নেন কারা কর্তৃপক্ষ। এ সময় তার কাছ থেকে তার শেষ কোন কথা থাকলে তাও শুনে নেন কারা কর্মকর্তারা। এরপর ধর্মীয় রীতি অনুসারে নিজামীকে তওবা পড়ান মাওলানা। এর আগেই তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেন কারা চিকিৎসক। জেলসুপার রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে বলে জানিয়ে দেন। জেলসুপার বলেন, এটাই আপনার শেষ রাত। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে। মাওলানা তাকে বলেন, আপনার কৃতকর্মের জন্য আদালত আপনাকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন। আপনি একজন মুসলমান ব্যক্তি। এ কারণে আপনি আল্লাহর এই দুনিয়ায় কৃতকর্মের জন্য তওবা করেন।

 

এরপর ইমাম সাহেব তাকে তওবা পড়ান। তওবা পড়ার মিনিট চারেক পর কনডেমড সেলে জল্লাদরা আসেন। রাতে তারা মীর কাশেম আলীকে নিয়ে যান ফাঁসির মঞ্চে। আগে থেকেই মঞ্চের পাশে রাখা ছিল মরদেহ বহনের জন্য এ্যাম্বুলেন্স। ফাঁসির মঞ্চে নেয়ার পর তার মাথায় পরানো হয় একটি কালো রংয়ের টুপি। এই টুপিটিকে বলা হয় ‘যমটুপি’। ফাঁসির মঞ্চে তোলার পর মীর কাশেম আলীর দুই হাত পেছন দিকে বাধা হয়। এ সময় ফাঁসির মঞ্চের সামনে উপস্থিত ছিলেন কারা কর্তৃপক্ষ, সিভিল সার্জন ও একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ফাঁসির মঞ্চে প্রস্তুত ছিলেন জল্লাদও। মঞ্চে তোলার পর তার দুই পা বাঁধা হয়। পরানো হয় ফাঁসির দড়ি।

 

কারা কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল একটি রুমাল। রুমালটি হাত থেকে নিচে ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের লিভারে টান দেন। লিভারটি টান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফাঁসির মঞ্চের নিচে চলে যান মীর কাশেম আলী। এ সময় তিনি মাটি থেকে ৪ থেকে ৫ ফুট শূন্যে ঝুলে থাকেন। এতে মুহূর্তের মধ্যেই তার ঘাড়ের হাড় ভেঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। ফাঁসি কার্যকরের পর মরদেহ তোলার পর কারা চিকিৎসক ঢাকা জেলার সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। এ সময় তার ঘাড়ের রগ কাটা হয়।

 

মীর কাশেম আলীর ফাঁসির লিভারে টান দিয়ে ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন করেন প্রধান জল্লাদ শাজাহান ও অন্য দু’জন জল্লাদ ছিলেন তার সহযোগী। এর আগে পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর করেছেন এসব জল্লাদই। ফাঁসি কার্যকর করার সময় ফাঁসির মঞ্চে ও কারাগারের ভেতরে যারা ছিলেন অতিরিক্ত কারা কর্মকর্তা, ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট), ঢাকার সিভিল সার্জন, পুলিশের উপকমিশনার, কারাগারের সিনিয়র জেলসুপার, জেলার, গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা, র‌্যাবের পক্ষ থেকে একজন এবং ডেপুটি জেলার। পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দলও ছিলেন কারাগারের ভেতরে বাইরে।

 

জানাজার শর্তারোপ

মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর তার জানাজা যেন ছেলে মীর আহমদ বিন কাশেম (আরমান) পড়ায়। এ তথ্য নিশ্চিত করেন মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর স্ত্রী খন্দকার আয়শা খাতুন। এর আগে মীর কাশেম আলী বলেছিলেন, তার নিখোঁজ ছেলে মীর আহমদ বিন কাশেমকে (আরমান) ফিরিয়ে না দিলে প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন না। গত ৯ আগস্ট থেকে ছেলে মীর আহমদ বিন কাশেম (আরমান) নিখোঁজ রয়েছেন।

 

মীর কাশেম আলীর পরিবারের অভিযোগ, তার বড় ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তুলে গিয়ে গেছে। এরপর থেকে কেউ সন্ধান দিচ্ছেন না। কেউ স্বীকারও করছেন না। মীর কাশেম আলীর স্ত্রী খন্দকার আয়শা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, মীর কাশেমের ইচ্ছে মৃত্যুর পর তার জানাজা যেন পড়ায় ছেলে মীর আহমদ বিন কাশেম। এটা তার অসিয়ত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামী নেতা মীর কাশেম আলী প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন না।

 

শুক্রবার লিখিতভাবে কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষকে এ কথা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এ কথা জানানোর পর মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকরে আর কোন বাধা রইল না। এ কথা জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন। মীর কাশেম আলী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

 

প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার বিষয়ে জানানোর পর যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করে মহড়া দেয়া হয়। প্রস্তুত রাখা হয় জল্লাদ দলকেও। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর জেলসুপার প্রশান্ত কুমার বণিক গণমাধ্যমকে বলেন, রায় কার্যকরের জন্য সরকারের আদেশের অপেক্ষা, আমাদের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন। গত মঙ্গলবার রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মীর কাশেম আলীর রিভিউ খারিজ সংক্রান্ত রায়ের কপি গাজীপুরে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ পেঁৗঁছানো হয়। রাত অনেক বেশি হওয়ায় তখন মীর কাশেম আলীকে রায় পড়ে শোনানো হয়নি।

 

বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রায় পড়ে শোনানো হয়। ৬৩ বছর বয়সী মীর কাশেম আলী ২০১২ সালে গ্রেফতারের পর থেকে এ কারাগারেই রয়েছেন। গত মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ রিভিউ আবেদন খারিজের রায় দেন। মীর কাশেম আলী জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম অর্থ যোগানদাতা ও জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তার ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হলো।

 

সর্বশেষ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর

এর আগে আরও শীর্ষ ৫ যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। যে শীর্ষ পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এদের মধ্যেÑ ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে। এর দুই বছর পর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ২১ নবেম্বর জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় একই দিনে। এ বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১১ মে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে।

 

এই পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর সবাইকেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে নাজিমউদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ৬৩ বছর বয়সী মীর কাশেম আলী ২০১২ সাল থেকে এ কারাগারে ছিলেন। শুরুতে কারাগারে ডিভিশন পেলেও ২০১৪ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর মীর কাশেম আলীকে এতদিন ধরে কনডেমড সেলে রাখা হয়। শনিবার রাতে কনডেমড সেল থেকে বের করে আইনানুগ প্রক্রিয়া ও রীতিনীতি অনুসরণ করে ধনকুবের যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হলো।

share on: